নীরব ওস্তাদের চাল চট্টগ্রামের এক সরু গলির শেষে পুরোনো কুস্তির মাঠটি ছিল। টিনের ছাদের নিচে ভেজা মাটির গন্ধ জমে থাকত। রিফাত প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে কাদের ওস্তাদের কাছে কুস্তি শিখত। শেষ লড়াইয়ের পর থেকে কাদের ওস্তাদ একটি কথাও বলেননি। তিনি হাতের ইশারা, চোখ আর মাটিতে দাগ কেটে সব বোঝাতেন। সেদিন কাদের ওস্তাদ রিফাতের ডান কাঁধে চাপ দিলেন। রিফাত শক্ত হয়ে দাঁড়াতেই তিনি মাথা নাড়লেন। তিনি আবার চাপ দিলেন, তারপর নিজের বাঁ পা এক ধাপ বাইরে রাখলেন। কোমর নিচু করে তিনি রিফাতের গোড়ালির পেছনে পা আটকালেন। একই সঙ্গে কনুই টেনে রিফাতকে ঘুরিয়ে নরম মাটিতে নামিয়ে দিলেন। রিফাত উঠে বলল, “আমি শক্ত করে দাঁড়ালে ভুল হয় কেন?” কাদের ওস্তাদ উত্তর দিলেন না। তিনি রিফাতের কাঁধ ঠেলে সামনে পাঠালেন, তারপর তার পিঠে হালকা চাপড় দিলেন। ঠিক তখন টিনের দরজা ঠেলে এক যুবক ঢুকল। তার নাম নাবিল, আর কাঁধে ছিল ধুলো ধরা একটি লাল ব্যাগ। নাবিল মাঠের মাঝখানে এসে বলল, “কাদের ওস্তাদ, আমি আপনার সঙ্গে লড়তে এসেছি।” কাদের ওস্তাদ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। নাবিল বলল, “শেষ লড়াইয়ের পর আপনি আর মাঠে নামেননি। আজও কি অন্য কাউকে সামনে দেবেন?” রিফাত এক পা এগিয়ে বলল, “ওস্তাদ এখন কাউকে কিছু প্রমাণ করেন না।” “তুমি কি তাঁর হয়ে লড়বে?” নাবিল জিজ্ঞেস করল। রিফাত কাদের ওস্তাদের দিকে তাকাল। ওস্তাদ ধীরে রিফাতের ডান কাঁধে হাত রাখলেন, তারপর মাটির গোল দাগের দিকে দেখালেন। দুজন গোল দাগের মধ্যে নামল। নাবিল শুরুতেই রিফাতের বুকের দিকে ধাক্কা দিল। রিফাত পিছিয়ে গেল, আর টিনের দেয়াল কেঁপে উঠল। নাবিল নিচু হয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। রিফাত দুই হাত দিয়ে ঠেকাতে গিয়ে আবার শক্ত হয়ে গেল। বাইরে দাঁড়ানো কাদের ওস্তাদ নিজের বাঁ পায়ের কাছে আঙুল দিয়ে একবার মাটি ছুঁলেন। রিফাত সকালের মতো সেই দাগটি দেখতে পেল। সে জোর করে নাবিলকে থামাল না। সে চাপের সঙ্গে এক ধাপ গেল, বাঁ পা বাইরে রাখল এবং কোমর নামাল। তারপর নাবিলের গোড়ালির পেছনে পা আটকে তার কনুই নিজের দিকে টানল। নাবিলের শরীর ঘুরে গেল, কিন্তু সে পড়ার আগে রিফাতের জামা চেপে ধরল। দুজনই হাঁটু গেড়ে মাটিতে পড়ল। নাবিল সঙ্গে সঙ্গে রিফাতের ঘাড় ধরতে চাইল। রিফাত মাথা সরিয়ে আবার একই পা বাইরে নিল। এবার সে তাড়াহুড়ো করল না। নাবিলের চাপ বাড়তেই রিফাত কনুই টানল, কোমর ঘোরাল, আর তাকে পিঠের ওপর নামিয়ে ধরে রাখল। কাদের ওস্তাদ দুইবার মাটিতে হাত চাপড়ালেন। রিফাত নাবিলকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নাবিল কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বলল, “এই চাল তিনি শেষ লড়াইয়েও করেছিলেন।” রিফাত মাটি থেকে তার লাল ব্যাগটি তুলে দিল। নাবিল ব্যাগ নিয়ে কাদের ওস্তাদের সামনে মাথা নিচু করল। কাদের ওস্তাদ গোল দাগে পা রাখলেন এবং শুকনো গলায় বললেন, “আবার।”