শেষ বাস সকাল আটটায় রূপা পুরনো বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ তার এই বাসে শেষ দিন। কাল থেকে তার নতুন কাজ শুরু। নতুন কাজটি শহরের অন্য পাশে। নাবিলও প্রতিদিন এই বাসে ওঠে। সে রূপার পেছনে দাঁড়ায়। তারা দুজন একই বাসে যায়। তারা দুজন একই জায়গায় নামে। কিন্তু তারা কখনও কথা বলে না। আজ বাস আসতে দেরি হচ্ছে। রূপা ঘড়ি দেখে। নাবিল রূপার হাতে ছোট ব্যাগ দেখে। নাবিল বলে, «আজও বাস দেরি করছে?» রূপা তার দিকে তাকায়। তারপর বলে, «হ্যাঁ, আজও দেরি করছে।» «আপনি কি প্রতিদিন এই বাসে যান?» «যাই। আপনি কি প্রতিদিন যান?» «যাই। আজও যাব।» রূপা একটু চুপ করে থাকে। বাসস্ট্যান্ডে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার পাশে চায়ের দোকান খোলা। কাপে চামচের শব্দ হয়। নাবিল বলে, «আপনাকে আমি প্রতিদিন দেখি।» রূপা বলে, «আমিও আপনাকে প্রতিদিন দেখি।» নাবিল এবার নিচের দিকে তাকায়। «আমি কথা বলতে চেয়েছি।» «কথা বলেননি কেন?» «জানি না। প্রতিদিন ভাবি, আজ বলব। তারপর বাস আসে।» «আজ বাস আসছে না।» «তাই আজ বলছি।» রূপা ব্যাগের ফিতা ঠিক করে। «আজ আমার শেষ দিন।» নাবিল মুখ তুলে বলে, «শেষ দিন মানে?» «কাল থেকে আমি এই বাসে যাব না। আমার নতুন কাজ হয়েছে।» «নতুন কাজ কোথায়?» «দক্ষিণের দিকে। সেখানে অন্য বাস লাগে।» নাবিল কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে, «তাহলে আমি দেরি করেছি।» রূপা বলে, «কিসের জন্য?» «আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য।» রূপা এবার হাসে না। সে নাবিলের মুখ দেখে। «আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন?» নাবিল পকেট থেকে ফোন বের করে। «আপনার ফোন নম্বর চাইতে চেয়েছিলাম।» «কেন?» «কথা বলার জন্য।» «বাসে তো কথা বলা যায়।» «আপনি কাল থেকে বাসে থাকবেন না।» রূপা একটু সময় নেয়। তারপর বলে, «আপনি কি সবার ফোন নম্বর চান?» «না। সবার সঙ্গে আমি প্রতিদিন বাসে যাই না।» রূপা এবার হালকা হাসে। «আমরা তো কথা বলিনি।» «তবু আপনাকে চিনি। আপনি আটটার বাস নেন। জানালার পাশে বসেন। শুক্রবারে কালো ব্যাগ নেন।» রূপা বলে, «আপনিও জানালার পাশে বসেন। আপনার হাতে সব সময় নীল ফাইল থাকে।» নাবিল নীল ফাইলটি দেখায়। «আজও আছে।» «আজ আপনার কাজ আছে?» «আছে। কিন্তু আজ অন্য কাজ আছে।» «কী কাজ?» «আপনার ফোন নম্বর নেওয়া।» বাসটি তখন সামনে এসে থামে। দরজা খোলে। মানুষ উঠতে শুরু করে। নাবিল ফোনটি রূপার দিকে বাড়িয়ে দেয়। «আপনি এখন নম্বর দেবেন?» রূপা ফোনটি নেয়। «এখন দেব। তবে আজ কথা বলতে পারব না।» «কেন?» «আজ নতুন কাজের কাগজ জমা দিতে হবে।» «তাহলে কাল?» «কাল আমি এই বাসে থাকব না।» «তাহলে কখন?» রূপা ফোনে নিজের নাম লেখে। «শুক্রবার সন্ধ্যায় সময় আছে?» «আছে।» «বাসস্ট্যান্ডের পাশে চায়ের দোকানে আসবেন?» «আসব।» «চা খাবেন?» «আপনি থাকলে খাব।» রূপা ফোনটি ফেরত দেয়। বাসের দরজায় লোক কমে গেছে। সে এক পা বাড়ায়, তারপর ফিরে তাকায়। «নাবিল, আপনার পুরো নাম কী?» নাবিল বলে, «নাবিল হোসেন। আপনার নাম রূপা, তাই তো?» রূপা মাথা নাড়ে। «হ্যাঁ। শুক্রবার ভুল করবেন না।» নাবিল বলে, «আপনিও ভুল করবেন না।» রূপা বাসে উঠে জানালার পাশে বসে। নাবিল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বাস চলে যায়। নাবিল ফোনে নতুন নম্বরটি দেখে। তারপর সে শুক্রবারের দিনটি ক্যালেন্ডারে লিখে রাখে।